প্রধান উপদেষ্টার দিকে তাকিয়ে দলগুলো

  • সরকারের বেঁধে দেওয়া সময় শেষ কাল, সমঝোতার বদলে দলগুলোর  মতভেদ আরও তীব্র হয়েছে 
  • গণভোটের সময় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টা দলগুলোর সঙ্গে বসবেন, নাকি সিদ্ধান্ত জানাবেন—এখন সেই অপেক্ষা

অনলাইন ডেস্ক: গণভোট কখন এবং জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের সুপারিশ নিয়ে মতভেদ নিরসনে নিজ উদ্যোগেই নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করে এক সপ্তাহের মধ্যে সিদ্ধান্ত জানাতে রাজনৈতিক দলগুলোকে অন্তর্বর্তী সরকার যে সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিল, সেই সময় শেষ হচ্ছে আগামীকাল সোমবার। তবে, সমঝোতা দূরের কথা, দলগুলো একসঙ্গে বসতেও পারেনি। বরং, গত ছয় দিনে বিএনপি বলয়, জামায়াতসহ দলটির মিত্র আটটি দল এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মধ্যে মতভেদ আরও তীব্র হয়ে সামনে এসেছে।

দলগুলো নিজেদের উদ্যোগে গতকাল শনিবার পর্যন্ত আলোচনায় বসতে না পারলেও বক্তব্য-বিবৃতিতে প্রায় সব দলই বলেছে, উদ্যোগ সরকারকেই নিতে হবে। কোনো কোনো দল আরও স্পষ্ট করে বলেছে, উদ্যোগ নিতে হবে প্রধান উপদেষ্টাকেই। যার কারণে, দলগুলো এখন তাকিয়ে আছে প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের দিকে। তিনি কি দলগুলোকে ডেকে আলোচনায় বসেন, নাকি মতভেদের ইস্যুগুলোতে নিজের বা সরকারের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন; করলে কী সিদ্ধান্ত দেন—সেটি দেখার অপেক্ষায় দলগুলো।

গত সোমবার উপদেষ্টা পরিষদের ‘জরুরি বৈঠক’ থেকে দলগুলোকে এক সপ্তাহের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। ঐ দিনের ‘জরুরি বৈঠক’ শেষে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে সংবাদ ব্রিফিংয়ে আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেছিলেন, ‘দলগুলোকে নিজ উদ্যোগে নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করে সম্ভাব্য দ্রুততম সময়ে, সম্ভব হলে এক সপ্তাহের মধ্যে সরকারকে ঐক্যবদ্ধ দিকনির্দেশনা দেওয়ার জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে। দিকনির্দেশনা না পেলে সরকার সরকারের মতো পদক্ষেপ নেবে।’

এর আগে গত ২৮ সেপ্টেম্বর বহুল আলোচিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫’ বাস্তবায়নের উপায়-সম্পর্কিত চূড়ান্ত সুপারিশ অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে হস্তান্তর করে ‘জাতীয় ঐকমত্য কমিশন’। তাৎক্ষণিকভাবেই গণভোটের সময়, সুপারিশের সঙ্গে যুক্ত করা সনদ থেকে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ‘ভিন্নমত’ তুলে দেওয়া, ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠন এবং ২৭০ দিনের মধ্যে সংস্কার না হলে প্রস্তাবসমূহ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানে যুক্ত হয়ে যাওয়ার সুপারিশসহ কয়েকটি ইস্যুতে দলগুলোর মধ্যে তীব্র মতবিরোধ দেখা দেয়। এর এক দিন পর ৩০ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে দলগুলোর মধ্যে সৃষ্ট বিরোধ নিয়ে আলোচনা হয়। দলগুলোর ‘তীব্র বিরোধ’কে ‘হতাশাব্যাঞ্জক’ হিসেবে উল্লেখ করে ঐ দিন সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ‘এই তীব্র বিরোধের মধ্যে সমঝোতা দলিল পাশ করা সরকারের সামনে দুরূহ চ্যালেঞ্জ এনে দিয়েছে।’ উপদেষ্টা পরিষদের ঐ দিনের বৈঠক শেষে সংবাদ ব্রিফিংয়ে আইন উপদেষ্টা বলেছেন, ‘গণভোট কখন হবে এবং ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন প্রধান উপদেষ্টা। তার নেতৃত্বে আমরা থাকব। আমরা সহায়তা করার জন্য থাকব। যে সিদ্ধান্ত নেব, এতে আমরা খুব দৃঢ় থাকব।’

মতভেদের মূল বিষয়গুলো

জুলাই সনদ বাস্তবায়নে ঐকমত্য কমিশন যে সুপারিশ করেছে সেখানে মোটা দাগে পাঁচটি ইস্যুতে দলগুলোর মধ্যে বড় ধরনের মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ নামে একটি আদেশ জারির সুপারিশ করেছে কমিশন। যাতে বলা হয়, এই আদেশের ভিত্তিতেই হবে গণভোট। আর আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনেই একসঙ্গে অথবা এর আগে যথোপযুক্ত সময়ে গণভোট আয়োজনের সুপারিশ করেছে কমিশন। তবে, বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নির্বাচনের দিনই গণভোট করতে হবে, এর আগে গণভোটের সুযোগ নেই। আর জামায়াতের দাবি সংসদ নির্বাচনের আগেই গণভোট করতে হবে।

‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ নামে যে আদেশ জারির সুপারিশ করেছে কমিশন, তা নিয়েও তীব্র মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে দলগুলোর মধ্যে। জামায়াত ও এনসিপি বলছে, রাষ্ট্রপতি নয়, এই আদেশ জারি করতে হবে প্রধান উপদেষ্টাকে। অন্যদিকে, বিএনপিসহ দলটির মিত্র দল-জোটগুলোর মতে, বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী এই ধরনের কোনো আদেশ জারির এক্তিয়ার প্রধান উপদেষ্টার নেই, আদেশ বা অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন কেবল রাষ্ট্রপতি।

ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশে বলা হয়েছে, আগামী জাতীয় সংসদ প্রথম ২৭০ দিন ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ হিসেবে কাজ করবে, এই সময়ের মধ্যে সংবিধান সংস্কার করে জুলাই সনদে এ-সংক্রান্ত প্রস্তাবসমূহ সংযোজন করা না হলে সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানে যুক্ত হয়ে যাবে। তবে, এ ব্যাপারে তীব্র আপত্তি তুলেছে বিএনপি। দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে সাড়ে আট মাসের ধারাবাহিক সংলাপে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’-এর বিষয়টি আসেনি। এটি চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানে যুক্ত হয়ে যাওয়ার বিষয়টিকেও ‘হাস্যকর’ মনে করছে বিএনপি।

ঐকমত্য কমিশন সুপারিশের সঙ্গে জুলাই সনদের যে কপি যুক্ত করেছে, সেটির সঙ্গে গত ১৭ অক্টোবর সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় স্বাক্ষরিত সনদের সঙ্গে বেশকিছু অমিল রয়েছে। বিশেষত, বিভিন্ন প্রস্তাবে স্বাক্ষরিত সনদে থাকা দলগুলোর ‘ভিন্নমত’ তুলে দেওয়া হয়েছে। এটিকে ‘দেশ ও জনগণের সঙ্গে প্রতারণা’ বলে তাত্ক্ষণিকভাবেই অভিহিত করেছে বিএনপি ও দলটির মিত্ররা। এছাড়া, কমিশনের সুপারিশে বলা হয়েছে, সংসদের নিম্নকক্ষে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যানুপাতিক (পিআর) পদ্ধতিতে ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষ গঠন হবে। তবে, এ ব্যাপারে শুরু থেকেই আপত্তি রয়েছে বিএনপির। দলটির প্রস্তাব হলো—ভোটের অনুপাতে নয়, নিম্নকক্ষে দলগুলোর প্রাপ্ত আসনের পিআর পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষ গঠন হতে হবে।

দলগুলোর কার কী অবস্থান :জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোট আয়োজনের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সব দলই একমত। মতবিরোধ গণভাটের সময় নিয়ে। বিএনপি আগের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে বলেছে, স্বাক্ষরিত সনদ অনুযায়ী ‘ভিন্নমত’সহ সংসদ নির্বাচনের সঙ্গেই গণভোট হতে হবে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী গতকাল ঢাকায় এক সেমিনারে বলেছেন, ‘যতটুকু ঐকমত্য হয়েছে, তা বাস্তবায়িত হবে। যেগুলোয় ঐকমত্য হয়নি, তা জনগণের কাছে নিয়ে যেতে হবে হবে। ঐকমত্যের বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।’ গণভোট প্রসঙ্গে বিএনপির এই নেতা বলেন, ‘এই সরকার সংবিধানের পরিপ্রেক্ষিতে গঠিত হয়েছে। সেই সংবিধানে গণভোটের কিছু নেই। যদি গণভোট করতে হয়, তাহলে বাংলাদেশের বর্তমান সংবিধান অনুসারে জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে সংসদে এসে সংসদে পাশ করার পরে সেই বিষয়গুলো গণভোটে যেতে পারে।’ জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেছেন, ‘নির্বাচনের আগেই গণভোট দিতে হবে। নির্বাচনের তপসিল ঘোষণার পরেও গণভোট করতে আইনি বাধা নেই। আর আদেশ জারি করতে হবে প্রধান উপদেষ্টাকে।’ ‘ভিন্নমত’ তুলে দিয়ে ঐকমত্য কমিশন যেভাবে সনদ বাস্তবায়নের সুপারিশ করেছে, সেভাবেই বাস্তবায়ন চায় জামায়াত।

অন্যদিকে, গণভোটের সময় নিয়ে অনড় অবস্থানে নেই এনসিপি। দলটির সদস্যসচিব আখতার হোসেন বলেছেন, সংসদ নির্বাচনের সঙ্গেই বা আগে গণভোট হতে পারে। যদিও এনসিপি এখন পর্যন্ত সনদে স্বাক্ষর করেনি, তবু দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, গণভোটে কোনো ‘নোট অব ডিসেন্ট’ থাকতে পারবে না এবং আদেশ জারি করতে হবে প্রধান উপদেষ্টাকে।

সরকারের ভাবনা :সরকারসূত্রে জানা গেছে, উদ্ভূত প্রেক্ষাপটে সব পক্ষের মতামতকে সমন্বয় করে মধ্যপন্থা অবলম্বনের কথা ভাবছে সরকার। সেক্ষেত্রে, সংসদ নির্বাচনের দিনেই গণভোট আয়োজনের সিদ্ধান্ত আসতে পারে। এ নিয়ে গত সোমবার অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের ‘জরুরি বৈঠকে’ও অনানুষ্ঠানিক আলোচনা হয়েছে। সংসদের নিম্নকক্ষে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের পিআর পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষ গঠন হবে—এমন সিদ্ধান্তও আসতে পারে সরকারের পক্ষ থেকে। এছাড়া, সংবিধান সংস্কার পরিষদে ২৭০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কার না হলে প্রস্তাবসমূহ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানে যুক্ত হয়ে যাবে বলে ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশে যেটা বলা হয়েছে সেটি বাদ দেওয়া হতে পারে। তবে, রাষ্ট্রপতি না প্রধান উপদেষ্টা—কে আদেশ জারি করবেন তা নিয়ে সরকারের একাধিক উপদেষ্টা আইন ও সংবিধান বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক কথা বলছেন বলে জানা গেছে।

এসব বিষয়ে গত ৩০ সেপ্টেম্বর উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক শেষে সংবাদ ব্রিফিংয়ে আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেছেন, ‘ঐকমত্য কমিশন দুটি বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছে। একটা হচ্ছে, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ, গণভোট, তারপর ২৭০ দিনের মধ্যে না হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধান সংশোধন হয়ে যাবে। তো এমন কোনো নজির আছে কি না, আদৌ সম্ভব কি না, এটা সরকার দেখছে। দ্বিতীয় প্রস্তাব হলো—এই দায়দায়িত্ব নির্বাচিত সংসদের হাতেই ছেড়ে দেওয়া। গণভোট কবে হবে—এটা নিয়ে দলগুলোর বিরোধ তীব্রতম পর্যায়ে পৌঁছে গেছে বোধ হয়। তো একটা সময়ে এটা নিয়ে আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আর তৃতীয় উপায় তো আছে, নির্বাচিত সংসদ একটা সংবিধান সংস্কার সভা হিসেবে কাজ করবে। তাদেরও দায়িত্ব আছে।’

Related Articles

Back to top button