এমআইসিএস জরিপ-২০২৫

ক্ষতিকর ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়া দেশের প্রায় অর্ধেক পানিতে
অনলাইন ডেস্ক: পর্যাপ্ত পানির উত্স থাকলেও পানির উত্তোলন এবং ব্যবস্থাপনা সংকটের কারণে নিরাপদ পানি বঞ্চিত হচ্ছে দেশের বড় অংশ মানুষ। নলকূপ, পাইপড ওয়াটার, টিউবওয়েল, কূপ ও বোরহোল—সব ধরনের পানির উত্স মিলিয়ে ৪৭ দশমিক ১ শতাংশ উেসই ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়া শনাক্ত হয়েছে। সম্প্রতি মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভের (এমআইসিএস) জরিপে এসব তথ্য উঠে এসেছে। জরিপটি পরিচালনা করা হয়েছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিসিএস) এবং জাতিসংঘ শিশু তহবিল- ইউনিসেফের সহযোগিতায়। এ জরিপে দুই-পর্যায়ের স্তরীভূত ক্লাস্টার স্যাম্পলিং পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে।
জরিপের তথ্যমতে, দেশের ৪৭ শতাংশ পানির উেস এবং ঘরে সংরক্ষিত ৮৫ শতাংশ পানিতে অতিমাত্রার ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে। অর্থাত্ উত্স থেকে ঘর পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াতেই পানি দূষণের মাত্রা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। পানি দূষণের মূল উত্সগুলো সাধারণত মল বা বর্জ্যের সংস্পর্শে আসা, অগভীর নলকূপ ব্যবহার, স্যুয়ারেজ লাইন ফুটো থাকা, কিংবা পানির উেসর আশপাশে নোংরা পরিবেশ থাকার কারণে মানুষ নিরাপদ পানি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের পানিতে ক্ষতিকর ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি একটি বড় উদ্বেগ, যা জনস্বাস্থ্যকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করে। এর ফলে ডায়রিয়া, পেটের সংক্রমণ এবং অন্যান্য গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যা হতে পারে। ই-কোলাইয়ের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে জল সরাসরি মলমূত্র বা স্যানিটেশন ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে দূষিত হচ্ছে, যা ডায়রিয়া, কলেরা এবং অন্যান্য জলবাহিত রোগের অন্যতম প্রধান কারণ।
জরিপে ৩ হাজার ১৪৯টি প্রাথমিক স্যাম্পলিং ইউনিট নির্বাচন করা হয়, যেখান থেকে ৬২ হাজার ৯৮০টি খানা গণনা করা হয়েছে। এই প্রতিবেদনে ১৭২টি সূচক উপস্থাপন করা হয়েছে, যার মধ্যে ২৭টি সূচক সরাসরি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সম্পর্কিত। এই জরিপের মাধ্যমে জেলা-ভিত্তিক প্রতিনিধিত্বমূলক উপাত্ত তৈরি করা হয়েছে। জরিপে জানা যায়, গ্রামীণ ও শহরাঞ্চল উভয় স্থানেই দূষণের হার বেশ উচ্চ। শহরাঞ্চলের চেয়ে গ্রামীণ পরিবেশে বাড়িতে জল দূষণের হার বেশি (গ্রামীণ ৮৭.৫%, শহরাঞ্চল ৭৮.৫%)। সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারের (সেকেন্ড কোয়ান্টাইল) পানীয় জলের মধ্যে ৯০ দশমিক ৪ শতাংশ ই-কোলাই দ্বারা দূষিত। ধনী পরিবারগুলোর মধ্যে দূষণের হার ৭৪ দশমিক ৩ শতাংশ। প্রতিবেদন অনুসারে, বাংলাদেশের জনসংখ্যার একটি বিশাল অংশ মৌলিক পানির সুবিধা পেলেও ৯৮ দশমিক ৬ শতাংশ পানির গুণমানের দিক থেকে বা নিরাপদ পানির প্রাপ্যতার ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পানি সংরক্ষণের পাত্র পরিষ্কার না থাকা, খোলা মুখের কলস বা বালতি ব্যবহার, পানির গ্লাস বা মগ পরিষ্কার না রাখা, শিশুদের হাত পানির পাত্রে ঢোকানো, কিংবা রান্নাঘর ও বাথরুমের পাশে পানি রাখা এসব কারণে ঘরে পানি সহজেই দূষিত হয়ে যাচ্ছে। ফলে উেস পানি তুলনামূলক কম দূষিত হলেও ঘরে এসে সেটি আরো বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। অর্থনীতিবিদ হোসেন জিল্লুর রহমান ইত্তেফাককে বলেন, ‘নিরাপদ পানি প্রাপ্যতার দিক থেকে আমরা এখনো অনেক পিছিয়ে। সবার জন্য পানি এবং সবার জন্য নিরাপদ পানি এক নয়। আমরা এসডিজিতে যে অর্জন করেছিলাম, সেটা নিয়ে আত্মতুষ্টিতে ভুগেছি এবং এখনো ভুগছি। কিন্তু নিরাপদ পানি পাওয়ার ক্ষেত্রে আমরা সেরকম সক্ষমতা দেখাতে পারছি না।’
প্রকাশিত জরিপে দেখা গেছে, ই-কোলাই ও আর্সেনিকমুক্ত পানি ব্যবহার করে ৩৯ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষ। অর্থাত্ কেবল পানির উত্স থাকলেই হবে না, পানির সুরক্ষা ও গুণমান নিশ্চিত করতে হবে। মৌলিক স্যানিটেশন সুবিধা ব্যবহার করে ৭৩ শতাংশ পরিবার, আর ৬৭ দশমিক ৯ শতাংশ পরিবার মৌলিক স্বাস্থ্যবিধি সুবিধা ভোগ করে। স্যানিটেশনের ক্ষেত্রে এই ঘাটতি এবং স্যানিটেশন সুবিধা থেকে মলমূত্রের অনিরাপদ নিষ্কাশনও জল দূষণের অন্যতম কারণ বলেও জরিপে উঠে এসেছে। ওয়াটার এইডের বাংলাদেশীয় প্রধান হাসিন জাহান ইত্তেফাককে বলেন, উত্স থেকে উত্তোলন এবং ব্যবস্থাপনায় সংকট দূর করা না গেলে ই-কোলাই এর প্রভাব থেকে মুক্ত থাকার সুযোগ নেই।




