আমন ঘরে তোলার ধুম, দামেও খুশি কৃষক

অনলাইন ডেস্ক: নতুন আমন ধানের গন্ধে এখন ম-ম করছে কৃষকের উঠান। ধান কাটা ও মাড়াইয়ে রীতিমতো ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা। ইতিমধ্যে সারা দেশে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ জমির ধান কাটা শেষ হয়েছে বলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে। দেশের হাট-বাজারগুলো এখন নতুন ধানে ভরে গেছে। আমনের উত্পাদন এবার কেমন হয়েছে? দামই-বা কেমন যাচ্ছে?
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এবার অতিবৃষ্টি ও বন্যার কারণে দেশের কিছু কিছু এলাকায় জলাবদ্ধতার ফলে জমির ধানে ক্ষতি হয়েছে। তবে ফলন ভালো হওয়ায় তা সামগ্রিকভাবে আমন উত্পাদনের উপর খুব বেশি প্রভাব ফেলবে না। তবে উত্পাদনের সঠিক তথ্য পেতে ধান কাটা শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। কৃষকরা জানিয়েছেন, বর্তমানে হাট-বাজারগুলোতে ধানের যে দাম পাচ্ছেন, তাতে তারা খুশি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এবার ২০২৫-২০২৬ মৌসুমে সারা দেশে ৫৭ লাখ হেক্টর জমিতে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল। এবং উত্পাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ১ কোটি ৭৮ লাখ মেট্রিক টন। এর মধ্যে দেশের বেশ কয়েকটি জেলায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি জমিতে আমন চাষ হয়েছে। এর মধ্যে দিনাজপুর, সুনামগঞ্জ, চট্টগ্রাম, নেত্রকোনা অন্যতম।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও কৃষি অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত কয়েক বছর ধরে দেশে ধারাবাহিকভাবে হেক্টর প্রতি আমনের গড় উত্পাদন বাড়ছে। গত ২০২৪- ২৫ মৌসুমে হেক্টর প্রতি আমনের গড় ফলন হয়েছে ২.৯৫ টন, যা আগের বছরের ২০২৩-২৪-এর গড় ২.৮১ টন থেকে বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া, ২০২২-২৩ অর্থবছরে হেক্টর প্রতি ২.৬৯ টন, ২০২১-২২ অর্থবছরে ২.৬১ টন, ২০২০-২১ অর্থবছরে ২.৫৫ টন উত্পাদন হয়েছে।
আমাদের নরসিংদী প্রতিনিধি নিবারণ রায় জানিয়েছেন, জেলায় এবছর গতবারের চেয়ে বেশি জমিতে আমনের আবাদ হয়েছে।
ইতিমধ্যে স্বল্প ও মধ্যম মেয়াদি আমন জাতের ধান কাটতে শুরু করেছেন কৃষকরা। নরসিংদী জেলার শস্যভাণ্ডার খ্যাত রায়পুরা, মনোহরদী, বেলাব ও শিবপুর উপজেলার জমি থেকে কৃষকরা পাকা ধান কেটে ঘরে তুলতে ব্যস্ত। ধান কাটা, মাড়াই ও ঘরে তোলার সময় গ্রাম জুড়ে উত্সবের আমেজ বিরাজ করছে। জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত ডেপুটি ডাইরেক্টর (শস্য) কেবিডি. সালাহ উদ্দিন টিপু ও অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্যান) কৃষিবিদ সুব্রত কান্তি দত্ত জানিয়েছেন, এবছর সময়মতো বৃষ্টিপাত হওয়ার কারণে ধানের ফলন খুবই ভালো হয়েছে।
নরসিংদী সদর উপজেলা শীলমান্দী গ্রামের কৃষক মতিউর রহমান জানান, তিনি এক একর জমিতে আমন ধান ফলিয়েছিলেন। জমিতে ফসলের উত্পাদন হওয়ার কথা ছিল ১৫ মণ। ধানও খুব ভালো হয়েছিল। কিন্তু ইঁদুর তার জমির ধান কেটে সর্বনাশ করে দিয়েছে। এখন তিনি ১০/১২ মণ পাবেন কি না, সন্দেহ রয়েছে।
পলাশ উপজেলার পারুলিয়া গ্রামের কৃষক বাচ্চু মিয়া জানান, তিনি প্রায় দুই একর জমিতে আমন ধান চাষ করেছেন। ধান খুবই ভালো হয়েছে। সময়মতো তুলতে পারলে তিনি লাভবান হবেন।
শিবপুর উপজেলার কৃষক তোফাজ্জল আহমেদ জানান, তার প্রায় সাত একর জমিতে বিভিন্ন জাতের আমন ধান চাষ হয়েছে। প্রতি একর জমিতে ৪০ থেকে ৫২ মণ ফলনের আশা করছেন তিনি।
রায়পুরা উপজেলার রহিমাবাদ গ্রামের কৃষক ডাক্তার রফিকুল ইসলাম ও কৃষক নূরু মিয়া বলেন, আমন ধান লাগানোর পর সময়মতো বৃষ্টি হওয়ার কারণে ফলন ভালো হয়েছে। পানি সেচের জন্য অতিরিক্ত টাকা গুনতে হয়নি। তার এক একর জমিতে সার, বীজ, কীটনাশকসহ ধান ঘরে তোলা পর্যন্ত খরচ হয়েছে ১৮ হাজার টাকা। যার বাজার মূল্য ২৩ হাজার টাকা। আমাদেররায়গঞ্জ (সিরাজগঞ্জ) সংবাদদাতা দীপক কুমার কর জানান, রায়গঞ্জে রোপা আমন ধান ঘরে তোলার ধুম পড়ে গেছে। ধান কাটা মাড়াই ও গোলাজাত করতে কৃষান কৃষানিরা এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন। ইতিমধ্যে উপজেলার প্রায় ৬৫ শতাংশ জমির ধান কাটা হয়ে গেছে। অবশিষ্ট জমির ধান দুই সপ্তাহের মধ্যে কাটা মাড়াই সম্পন্ন হতে পারে বলে উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানাগেছে। উপজেলার চান্দাইকোনা ইউনিয়নের প্রান্তিক কৃষক সিমলা গ্রামের আব্দুস ছাত্তার জানান, তিনি দুই বিঘা জমিতে ব্রিধান-১০৩ আবাদ করেছিলেন। কাটা মাড়াই করে ধান পেয়েছেন ৩২ মণ। খরচের বিষয়ে তিনি বলেন, বিঘাপ্রতি খরচ হয়েছে প্রায় ৮ হাজার টাকা। ধামাইনগর ইউনিয়নের বিনোদনবাড়ি গ্রামের কৃষক মণিলাল মাহাতো জানান, তিনি তিন বিঘা জমিতে কাটারিভোগ ধানের আবাদ করেছিলেন। কারেন্ট পোকার আক্রমণের কারণে ফলন কম হয়েছে। মোট ধান পেয়েছেন ৩৮ মণ। তার খরচ হয়েছে বিঘাপ্রতি প্রায় সাড়ে ৭ হাজার টাকা। বাজারে এবার এ ধান বিক্রি করেছেন ১৮৪০/- টাকা মণ দরে। গত বছরের তুলনায় মণে প্রায় ১০০ টাকা দাম বেশি পেয়েছেন বলে জানান তিনি। একই ইউনিয়নের কৃষ্ণপুর গ্রামের কৃষক নাজমুল ইসলাম বলেন, তিনি ২৮ বিঘা জমিতে স্বর্ণা ৫ ও ব্রিধান ৫১-এর আবাদ করেছেন। মাজরা পোকা ও কারেন্ট পোকার (বাদামী গাছ ফড়িং) আক্রমণে কীটনাশক তিন বার দিতে হয়েছে। এতে ফলন কিছুটা কম হয়েছে। গড়ে বিঘাপ্রতি ধান পেয়েছেন ১৪/১৫ মণ হারে। খরচ হয়েছে প্রতি বিঘায় প্রায় ৯ হাজার টাকা। বাজারে এসব ধান বিক্রি হচ্ছে ১২৫০ টাকা থেকে ১৩০০ টাকা। গত বছরেও এধরনের দামই ছিল বলে জানান। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যারা মাঠে নিজেরা কাজ করতে পারে তাদের খরচ কম হয়, তাদের মোটামুটি লাভ থাকে।
উপজেলা কৃষি অফিসার মো. মোমিনুল ইসলাম জানান, এবার আগাম আমন ধানের চেয়ে নাবি ধানের ফলন ভালো হয়েছে। শুরুতে অতিবৃষ্টিতে কিছু কিছু এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ায় প্রায় ১০৪ হেক্টর জমিতে ধানের আবাদ হয়নি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি ইত্তেফাককে বলেন, ভারতের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে ঝটিকা বাতাস ও বৃষ্টির কারণে গড়ে প্রায় ১২১ হেক্টর জমির ধান আংশিক ক্ষতি হয়েছে। তবে নতুন নতুন জাত যেমন ব্রিধান ১০৩, ১০৮ ও ১১০ সহ উফশী ধানের চাষ ও সঠিক সময়ে বালাই ব্যবস্থাপনা করার কারণে এবার ফলন ভালো হয়েছে।




